উসমানী সাম্রাজ্যের ভাতৃহত্যার আইন

mybestanh123
0


#উসমানীয়_সম্রাজ্যে_ভাতৃহত্যা_আইন

.

উসমানীয় সম্রাজ্যে ভাতৃহত্যা শুরু হয় সুলতান উসমান গাজীর শাসনামল থেকে। উসমানীয় সম্রাজ্যের ১ম সুলতান উসমান গাজী ১২৯৮ সালে তার বিদ্রোহী চাচা দুন্দার বে'কে হত্যা করেন। এরপর ১৩৬২ সালে তৃতীয় উসমানীয় সুলতান প্রথম মুরাদ বিদ্রোহের অভিযোগে তার সৎভাই খলিল পাশা এবং তার ছেলে সাবচি বে'কে হত্যা করেন। এরপর চতুর্থ উসমানীয় সুলতান বায়েজিদ ইয়িলদিরিম কসোভা প্রান্তরে তার ভাই ইয়াকুব চেলেবি কে বিদ্রোহের আশংকায় হত্যা করে সিংহাসনে আরোহন করেন।

.

ফাতিহ সুলতান মেহমেদ খান দ্বিতীয় এর আগে ভাতৃহত্যায় কোনো আইন ছিলো না। তখন বিদ্রোহের আশংকায় বা বিদ্রোহের পরিবর্তী সময়ে শাহাজাদাদের মৃত্যুদন্ড দেওয়া হতো। সম্রাজ্য গৃহযুদ্ধ এড়াতে এবং সম্রাজ্যের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সুলতান দ্বিতীয় মোহাম্মদ ভাতৃহত্যাকে আইনে রূপান্তরিত করার সিদ্ধান্ত নেন। এবং ১৪৫১ সালে সিংহাসনে দ্বিতীয়বার আরোহন করার পরে ভাতৃহত্যাকে "Law of Fratricide" (ল্য অব ফ্র্যাট্রিসাইড) উসমানীয় আইনে লিপিবদ্ধ করেন।

.

এ আইনে উসমানীয় যুগের বড় বড় ইমামরা উসমানীয় সুলতানদের তাদের ভাইদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার অনুমতি দেন। যাতে গৃহযুদ্ধ এড়ানো যায় এবং রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে পড়তে না হয়।

.

উসমানীয় সাম্রাজ্যের ইতিহাস জুড়ে, ৬০ জন মতান্তরে ৮০ জন রাজপুত্রকে মৃত্যু'দণ্ড দেওয়া হয়েছিল। তাদের মধ্যে ১৬ জনকে সুলতানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের কারণে এবং ৭ জনকে বিদ্রোহের প্রচেষ্টার জন্য এবং অন্যদের সাম্রাজ্যের স্বার্থে সম্ভাব্য বিদ্রোহ ঠেকাতে হ'ত্যা করা হয়েছিল।

.

উক্ত আইনে যুগের ইমামরা "সূরা কাহাফ এর ৮০-৮১ নং আয়াত" এর ব্যাখ্যা দিয়ে ভাতৃহত্যা আইনকে বৈধতা দেন। তবে অনেক সময় মুফতিরা ভাতৃহত্যা আইনে রায় না দিলে সুলতানগণ সামরিক কাজি থেকে ফতোয়া নিয়ে শাহাজাদাদের মৃত্যুদন্ড প্রদান করতেন। 

.

তবে এই আইন এক সময় বাতিল/বিলুপ্ত করা হয়। ১৬০৩ সালে সিংহাসনে আরোহণের পর সুলতান প্রথম আহমেদ তার ভাইদের হ'ত্যা করেননি। তার এই আচরণের কারণ হয়ত তার পূর্ববর্তী সুলতান তৃতীয় মেহমেদের বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভের ফলাফল। সিংহাসনে আরোহণের পর তৃতীয় মেহমেদ তার ১৯ জন ভাইকে হ'ত্যা করেছিলেন।

.

১৬১৭ সালে সুলতান প্রথম আহমদ ভাতৃহত্যা আইন বিলুপ্ত ঘোষণা করেন। এবং ভাতৃহত্যার পরিবর্তে জ্যেষ্ঠতম পুরুষ সদস্যদের সিংহাসনে আরোহন এর আইন প্রণয়ন করেন। "আকবরিয়্যাত" নামে এই আইন সম্রাজ্যের শেষ সময় পর্যন্ত স্থায়ী হয়। 

.

কোন ঘটনাকে তার সময়কালের নির্দিষ্ট পরিস্থিতি, স্থান ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিবেচনা না করে মূল্যায়ন করা ভুল। আমার মতে, সেই সময়কালের নির্দিষ্ট পরিস্থিতি, স্থান ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিবেচনায় উসমানীয়দের ভাতৃহত্যা আইন সাহাসী, যুগোপযোগী একটি সিদ্ধান্ত ছিলো। হয়তো আবেগ এবং বিবেক উভয়ভাবেই ভ্রাতৃহত্যা বোধগম্য নয়, কিন্তু এটি সেই বিষয়গুলোর মধ্যে একটি ছিল যা উসমানীয় সাম্রাজ্যকে শতাব্দী ধরে টিকিয়ে রেখেছিল। 

.

আমার মতে উসমানীয় সম্রাজ্যে ভাতৃহত্যা আইন সাহসী, যুগোপযোগী, শক্তিশালী একটি সিদ্ধান্ত ছিলো। কেননা ভাতৃহত্যা আইন বন্ধ করার পরে উসমানীয় খিলাফত পতনের দিকে ধাবিত হয়। 

#ভাতৃহত্যা_আইন

#আকবরিয়্যাত_আইন

---

আগের পর্বে উসমানীয় সম্রাজ্যে ভাতৃহত্যা আইন সম্পর্কে লিখেছিলাম। অনেক ইতিবাচক আবার অনেকে নেতিবাচক ভাবে কমেন্টে তাদের মতামত জানিয়েছেন। অনেকে ভাতৃহত্যা আইনকে ভালো আবার অনেকে খারাপ বলেছেন। আসলে বর্তমান সময়ে এসে আমরা পরিস্থিতির আলোকে সেই সময়টা সম্পূর্ণ উপলব্ধি করতে পারবো না। উসমানীয় সম্রাজ্যের ভাতৃহত্যা আইন ভালো ছিলো? নাকি আকবরিয়্যাত তথা ভাতৃহত্যা বিলুপ্তির আইন ভালো ছিলো?? সেটা সম্পর্কে বিস্তারিত জানবো।

---

১৫ তম উসমানীয় সুলতান প্রথম আহমদ ১৬০৩ সালে সিংহাসনে আরোহন করার ১৩ বছর পরে ১৬১৭ সালে ভাতৃহত্যা আইন বন্ধ করেন। এবং আকবরিয়্যাত নামে জ্যেষ্ঠতম পুরুষ সদস্যের সিংহাসনে আরোহন এর আইন প্রণয়ন করেন।

---

৪ বছর পরে ১৬২২ সালে ১৬ তম উসমানীয় সুলতান প্রথম মোস্তফা'র শাসনামলে এসে আকবরিয়্যাত আইনটি কাফি'তে রূপান্তরিত হয়। কাফি হলো প্রাসাদের একটি বিশেষ জায়গায় সিংহাসনে আরোহন করার আগ পর্যন্ত শাহাজাদাদের বন্দী করে রাখার রীতি।

---

এই আইনে শাহাজাদাদের প্রাসাদে সার্বক্ষণিক প্রহরায় বন্দী করে রাখা হতো। বন্দী শাহাজাদাদেরকে রাজনৈতিক, প্রশাসনের, সামরিক ও অর্থনৈতিক অভিজ্ঞতা লাভের কোনো সুযোগ দেওয়া হতো না। সিংহাসনে আরোহনের আগ পর্যন্ত তারা বন্দী জীবন-যাপন করতো। 

---

সুলতান প্রথম আহমদ হয়তো গর্ব করতেন যে তিনি ভাতৃঘাতী আইনের স্থলে একটি মানবিক আইন চালু করেছেন। কিন্তু বাস্তবে সেটি নয়। এই আইন ছিলো আরো ধংসাত্মক ও মারাত্মক। কেননা বন্দী থাকায় শাহাজাদাদের সব যোগ্যতা নষ্ট হয়ে যেতো। বের হয়ে এলে তাদের সম্রাজ্য শাসন করার কোনো যোগ্যতা থাকতো না। 

---

আকবরিয়্যাত আইনের আগে প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার পরে শাহাজাদাদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সকল যোগ্যতা অর্জনের জন্য সানজাকে পাঠানো হতো। কিন্তু আকবরিয়্যাত আইন করার পরে তাদের এই দক্ষতা নষ্ট হয়ে যায়। 

---

২১ তম উসমানীয় সুলতান দ্বিতীয় সুলাইমান তার ৪৫ বছরের জীবনে ৪০ বছর বন্দী ছিলেন।শাহাজাদা ইব্রাহিম তার ৩২ বছরের জীবনে ২২ বছর বন্দী ছিলেন। 

---

☞ভাতৃহত্যা আইন এবং ভাতৃহত্যা বন্ধ তথা আকবরিয়্যাত আইন👇

---

ইতিহাস সাক্ষী যতদিন উসমানীয় সম্রাজ্যে ভাতৃহত্যা আইন চালু ছিলো ততদিন তারা দোর্দন্ড প্রতাপে বিশ্ব শাসন করেছিলো। ১৬৫০ সাল পর্যন্ত উসমানীয়রা কৃষ্ণ সাগর, ভূমধ্যসাগর সহ তিন মহাদেশ শাসন করেছিলো দোর্দন্ড প্রতাপে। উক্ত সময় তৎকালীন বিশ্বে উসমানীয় খিলাফত এর প্রতিদ্বন্দ্বী আর কোনো সম্রাজ্য ছিলো না। এর কারণ কি??

---

কারণ যদিও তখন ভাতৃহত্যা আইন চালু ছিলো। কিন্তু সুলতান এবং প্রত্যেক শাহাজাদা, এমনকি সকল রাজনৈতিক, প্রশাসনিক কর্মকর্তারা রাজনৈতিক, প্রশাসনিক সকল ক্ষেত্রে যোগ্যতা অর্জন করতো। ফলে তারা উসমানীয় খিলাফতকে সফলতার স্বর্ণ শিখরে তুলতে পেরেছিলো। 

---

কিন্তু ১৬১৭ সালে আকবরিয়্যাত আইন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে শাহাজাদাদের প্রাসাদে সার্বক্ষণিক প্রহরায় বন্দী করে রাখা হতো। বন্দী শাহাজাদাদেরকে রাজনৈতিক, প্রশাসনের, সামরিক ও অর্থনৈতিক অভিজ্ঞতা লাভের কোনো সুযোগ দেওয়া হতো না। সিংহাসনে আরোহনের আগ পর্যন্ত তারা বন্দী জীবন-যাপন করতো। বন্দী থাকায় শাহাজাদাদের সব যোগ্যতা নষ্ট হয়ে যেতো। বের হয়ে এলে তাদের সম্রাজ্য শাসন করার কোনো যোগ্যতা থাকতো না।

---

ফলে ১৬৮৩ সালের পরে উসমানীয়রা আর ইউরোপে আধিপত্য বিস্তার করতে পারে নি। অধিকাংশ অঞ্চল উসমানীদের হাতছাড়া হয়ে যায়। যোগ্যতা না থাকায় অযোগ্য শাসকরা সিংহাসনে আরোহন করেন। ফলে দূর্বল কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বিভিন্ন সমস্যা, ইহুদি খ্রিস্টানদের ষড়যন্ত্রের ফলে উসমানীয় খিলাফত পতনের দিকে ধাবিত হয়। 

---

এখন আমরা যদি নিরপেক্ষভাবে চিন্তা করি তাহলে, সেই সময়ের আলোকে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় কোন আইনটি গ্রহনযোগ্য ছিলো?? ভাতৃহত্যা আইন?? নাকি আকবরিয়্যাত আইন?? 

---

আমার মতে উসমানীয় সম্রাজ্যে ভাতৃহত্যা আইন সাহসী, যুগোপযোগী, শক্তিশালী একটি সিদ্ধান্ত ছিলো। কেননা ভাতৃহত্যা আইন বন্ধ করার পরে উসমানীয় খিলাফত পতনের দিকে ধাবিত হয়। কেননা ভাতৃহত্যা আইন সেই বিষয়গুলোর মধ্যে একটি ছিল যা উসমানীয় সাম্রাজ্যকে শতাব্দী ধরে টিকিয়ে রেখেছিল।





 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)