উসমানী- ভেনিস যুদ্ধ ১৫৭০-১৫৭৩

mybestanh123
0

 


#উসমানীয়_ভেনিস_যুদ্ধ_১৫৭০_১৫৭৩

--

১৫৭০ সালের এইদিনে ১লা আগস্ট সুলতান দ্বিতীয় সেলিম এর নেতৃত্বাধীন উসমানীয়দের নিকটে ভেনিস সাম্রাজ্য চরমভাবে পরাজিত হয়। পরে, পোপের ব্যাপক আহ্বান ও প্রচেষ্টায় ভেনিস, স্পেন, সিসিলি, নেপলস, পাপাল, জেনোয়া, টুসক্যানি, উরবিনো, সেভয়, মালটা ও গ্রীসের সম্মিলিত শক্তি যুদ্ধে অবতীর্ণ হয় এবং আবারো পরাজিত হয়।

--

যুদ্ধটি অত্যান্ত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। শুরুতে উসমানীয়রা পুরো ভেনিস দখল করে ফেলে। কিন্তু দুই মাস পরে অতি গোপনীয়তায় ইউরোপের খ্রিস্টান শক্তি ঐক্যবদ্ধ হয় এবং লেপান্তো’র যুদ্ধে তারা উসমানীয় নৌবহরকে ধ্বংস করে ফেলে। উসমানীয়রা দ্রুত তাদের নৌ বাহিনী পুনর্গঠন করে এবং ভেনিসকে চূড়ান্ত ভাবে পরাজিত করে।

--

বৃহৎ ও ধনী দ্বীপরাষ্ট্র সাইপ্রাস ১৪৮৯ সাল থেকে ভেনিসের শাসনাধীন ছিল। তারা মিশরের মামলুক সুলতানদের বার্ষিক খাজনা প্রদান করত। কিন্তু ভেনিসের মধ্য দিয়ে মক্কাগামী মুসলিম হজ্জযাত্রীদের বারবার আক্রমণ করা হতো এবং উসমানীয় নৌ বহর প্রায়শই হামলার শিকার হতো। ফলে উসমানীয়রা এদিকে চোখ ফেরায়।

--

ভেনিসে ধর্মীয়ভাবে তীব্র সমস্যা ছিল। অর্থোডক্স খ্রিস্টানদের প্রতি অত্যাচার এবং দুঃসাধ্য কর আরোপের ফলে, তাদের মাঝে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দেয় এবং তারা উসমানীয়দের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ১৫৭০ সালে উসমানীয়রা ভেনিসে দূত প্রেরণ করে। কিন্তু খ্রিস্টান রাজ্যসমূহের সহায়তার আশায় উসমানীয় দূতের সকল প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে দেয় ভেনিস।

--

১৫৭০ সালের ২৭ জুন উসমানীয়রা প্রায় ৪০০ জাহাজ ও ৮০ হাজার সৈন্য নিয়ে সাইপ্রাস এর দিকে যাত্রা করে। তারা ৩রা জুলাই লারনাকার নিকটে স্যালাইনে অবতরণ করে এবং রাজধানী নিকোসিয়ার দিকে অগ্রসর হয়। পথিমধ্যে ভেনিসিয়ানরা তীব্র প্রতিরোধের চেষ্টা করলেও উসমানীয় আর্টিলারির মুখে তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

--

নিকটবর্তী সকল ঘাঁটি থেকে খ্রিস্টান সৈনিকরা অজেয় "নিকোশিয়া" দূর্গে জড়ো হয় এবং বর্ধিত সেনাদল না আসা পর্যন্ত দূর্গ ধরে রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। উসমানীয়রা ২২ই জুলাই থেকে ৯ই সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিকোসিয়া দূর্গ অবরোধ করে। শহরের নবনির্মিত "ট্রেস ইতালীয়নি" দেয়াল উসমানীয় আর্টিলারির বোমাবর্ষণের মুখেও সুস্থির থাকে।

--

অবশেষে লালা মোস্তফা পাশার অধীনে উসমানীয়রা দূর্গের চতুর্দিকের গভীর নালা ভরাট করে ফেলে। ফলে, ৪৫ দিন অবরোধের পর ৯ই সেপ্টেম্বর উসমানীয়রা দূর্গের দেয়ালে পৌঁছে যায় এবং তা অতিক্রম করে।

--

উসমানীয়দের নিকোশিয়া বিজয়ের সময় ইউরোপের সম্মিলিত খ্রিস্টান জোটের ২০০টি জাহাজ ক্রিট দ্বীপে একত্রিত হয়েছিল। কিন্তু তারা সাইপ্রাসের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়ার পূর্বেই নিকোশিয়ার পতন ঘটে। এই খবরে তারা হতোদ্যম হয়ে ফিরে যায়। এরপর ভেনিসের কিরেনিয়া দুর্গ কোন প্রতিরোধ ছাড়াই আত্মসমর্পণ করে।

--

১৫ই সেপ্টেম্বর উসমানীয় বাহিনী ভেনিসের সর্বশেষ দুর্গ ফামাগুস্তা’র সামনে হাজির হয়। ৯০টি কামান ও ১৪৫টি বন্দুক সম্বলিত প্রায় ৮,৫০০ সৈনিক উসমানীয়দের প্রায় ২ লক্ষ সৈন্যের বিপরীতে যুদ্ধে নিতান্ত অনিচ্ছুক ছিল।

--

কিন্তু পোপের আদেশে যুদ্ধ করতে হয়। ভেনিসীয়রা ফামাগুস্তা দূর্গের চতুর্দিকে ৩ মাইল ট্রেঞ্চ খনন করে। কিন্তু উসমানীয়রা এসে ঐ ট্রেঞ্চের দখল নেয়। ফলে, দূর্গটি তাদের আর্টিলারি রেঞ্জের মধ্যে চলে আসে। কিন্তু তাদের পূর্ণ শক্তি দূর্গের নিকটে মোতায়েন করার সুযোগে খ্রিস্টানরা সমুদ্রপথে শক্তিবৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়।

--

দীর্ঘকালের যুদ্ধে ক্লান্ত উসমানীয়রা এখানে সন্ধি করতে আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু ব্যাপক শক্তিবৃদ্ধির গর্বে উন্মত্ত সম্মিলিত খ্রিস্টান শক্তি সন্ধির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। ফলে, যুদ্ধ শুরু হয় এবং ইউরোপের সম্মিলিত খ্রিস্টান শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে ১৫৭১ সালের ১ আগস্ট উসমানীয়রা দূর্গটি বিজয় করতে সক্ষম হয়।

--

ফামাগুস্তা যুদ্ধে উসমানীয়দের প্রায় ৫০ হাজার সৈন্য হতাহত হয়। তথাপি খ্রিস্টান সৈন্য ও বাসিন্দাদের শহর থেকে শান্তিপূর্ণভাবে চলে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু শহরে প্রবেশ করে সেনাপতি লালা মুস্তফা জানতে পারেন যে, অবরোধের সময় বেশকিছু মুসলিম বন্দিকে বিভিন্ন পাশবিক নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে।

--

লালা মুস্তফা অত্যাধিক ক্ষিপ্ত হন। তিনি ইউরোপীয় খ্রিস্টানদের চরম শিক্ষা দিতে মনঃস্থির করেন। খ্রিস্টান সেনাপতি ব্রাগাডিনকে ধরে জীবীত অবস্থায় অঙ্গ-প্রত্যাঙ্গ বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়; তার সামনে তার সঙ্গীদের হত্যা করা হয় এবং অবশেষে তার শরীর থেকে চামড়া খুলে নিয়ে সমগ্র দ্বীপে প্রদক্ষিণ করানো হয়।

--

ব্যার্থ ভেনিস মিত্র খুঁজতে শুরু করে। পোপ পঞ্চম পিয়াস এর মধ্যস্থতায় ১৫৭১ সালের ১৫ই মে “হলি লীগ” গঠিত হয়। ২০০টি যুদ্ধ জাহাজ, ১০০টি রশদবাহী জাহাজ ও ৫০ হাজার সৈন্যের মিত্রবাহিনী নৌবহর ২৬ সেপ্টেম্বর কর্ফু পৌঁছায়। মুয়েজিনজাদে আলী পাশার নেতৃত্বে উসমানীয় নৌবহর তখন লেপান্তো বন্দরে অবস্থান করছিল।

--

এখানে উসমানীয়দের ২৭৮টি কাঠের জাহাজ, খ্রিস্টানদের ২১২টি লৌহ কাঠামোর জাহাজ ছিল। উভয় নৌবহরে সৈনিক ছিল সমসংখ্যক, প্রায় ৩০ হাজার করে। উসমানীয়দের ৫০ হাজার আর খ্রিস্টানদের ২০ হাজার নাবিক ছিল। উসমানীয়দের তুলনায় খ্রিস্টানদের দ্বিগুণ কামান থাকলেও উসমানীয়রা যুদ্ধে অভিজ্ঞ ছিল।

--

৭ই অক্টোবর দুই বাহিনী লেপান্তো’র নিকটে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। খ্রিস্টানদের লৌহ কাঠামো জাহাজের হামলায় উসমানীয়দের কাঠের নৌবহর চরমভাবে ধ্বংস হয়ে যায়। তাদের প্রায় ৩০ হাজার সৈন্য নিহত ও প্রায় ১২ হাজার খ্রিস্টান দাস মুক্ত হয়ে যায়। তাদের সম্পদের ক্ষতি গুরুত্বপূর্ণ না হলেও অভিজ্ঞ সৈনিক হারানো ছিল চরম ক্ষতি।

--

যুদ্ধের পর প্রচণ্ড শীত নামায় খ্রিস্টানরা আর অগ্রসর হতে পারেনি। কিন্তু শীতের মাঝেই উসমানীয়রা দ্রুত নৌ শক্তিকে দ্রুত পুনর্নির্মাণ করে ফেলে। তারা ভেনিসের ডালমাশিয়া দখল করে এবং প্রচুর সম্পত্তি অধিকার করে। তারা হাভার দ্বীপে আক্রমণ করে হাভার, স্টারি গ্র্যাড ও ভ্রবোস্কা শহর অধিকার করে নেয়।

--

পরের বছর মিত্র নৌবাহিনী পুনরায় অভিযান শুরু করে। তারা কিলিচ আলী পাশার ২০০ জাহাজের নৌবাহিনীর মুখোমুখি হয়। উসমানীয়দের সংখ্যাগত শ্রেষ্ঠত্ব ছিল। কিন্তু সেনাপতি তার তাড়াহুড়ো করে কাঁচা সবুজ কাঠ নির্মিত জাহাজ আর অনভিজ্ঞ সৈনিক সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। তাই তিনি সংঘর্ষ এড়িয়ে মডন দুর্গের দিকে রওনা হন।

--

এরই মাঝে স্প্যানিশ বিশাল স্কোয়াড্রনের আগমনের ফলে উভয় পক্ষের জাহাজ সংখ্যা সমান হয়ে যায়। খ্রিস্টানদের জন্য আবারও বিজয়ের দারুণ সুযোগ এসে যায়। কিন্তু তাদের নেতাদের মধ্যে পারস্পারিক দ্বন্দ্বের কারণে সুযোগটি নষ্ট হয়। এমনকি ১৫৭৩ সালে হলি লীগের নৌবহর বিলুপ্ত হয়ে যায়।

--

১৫৭৩ সালের ৭ই মার্চ স্বাক্ষরিত চুক্তির ফলে সাইপ্রাস উসমানীয় প্রদেশে পরিণত হয় এবং ভেনিস বার্ষিক ৩ লক্ষ ডুকাট ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে স্বীকৃত হয়। ডালমাশিয়া ছিল ভেনিসের সবচেয়ে কৃষি উর্বর এলাকা। এটা উসমানীয়দের হস্তগত হওয়ায় ভেনিসের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়ে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)