#সেলজুক_সাম্রাজ্যের_সর্বশেষ_শক্তিশালী_সুলতান_আহমেদ_সেঞ্জার!
সেলজুক সাম্রাজ্যের সর্বশেষ, শক্তিশালী ও সাহসী সুলতান আহমেদ সেঞ্জার। তিনি সেলজুকদের ত্রাণকর্তা সুলতান আল্প আরসালান এর নাতী ও সুলতান মালিক শাহের তৃতীয় পুত্র। তিনি ১০৮৬ খ্রিস্টাব্দে সিরিয়া এবং আল-জাজিরার মধ্যবর্তী সীমান্তে অবস্থিত সেনজার শহরে জন্মগ্রহণ করেন। সেলজুক সুলতানদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম এবং তিনি দীর্ঘ ৪০ বছর সম্রাজ্য শাসন করেছিলেন।
এক বর্ননায় পাওয়া যায়, আহমেদ সেঞ্জার ১০৯০ থেকে ১১১৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দীর্ঘ ২৮ বছর সেলজুক সাম্রাজ্যের প্রাণকেন্দ্র "খোরাসান" শাসন করেন। আরেক বর্ণনায় পাওয়া যায় আহমেদ সেঞ্জার ১০৯৭ থেকে ১১১৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দীর্ঘ ২১ বছর সেলজুক সাম্রাজ্যের প্রাণকেন্দ্র "খোরাসান" শাসন করেন।
আহমেদ সেঞ্জার খোরাসান এর আমির হলে অনেক শাসক তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন আর সেলজুক সাম্রাজ্যে ভঙ্গন ধরে। ফলে একটি রাজবংশীয় যুদ্ধ শুরু হয়। ১১০২ খ্রিস্টাব্দে তিরমিজের নিকটবর্তী এলকায় জিবরাইল আরসালান খানকে পরাজিত করে কাশগরিয়ার একটি আক্রমণ প্রতিহত করেন। ১১০৭ খ্রিস্টাব্দে তিনি ঘুরি সাম্রাজ্যের শাসক ইযযুদ্দীন হোসাইনের এলাকায় আক্রমণ করে তাকে বন্দী করেন। পরবর্তীতে তিনি তাকে রাজস্বের বিনিময়ে মুক্ত করে দেন। ১১১৭ খ্রিস্টাব্দে , তিনি গজনীর সুলতান আরসলান শাহের বিরুদ্ধে গজনীর যুদ্ধে তাকে পরাজিত করে এবং সেলজুক সামন্ত হিসাবে আরসলানের ভাই বাহরাম শাহকে সিংহাসনে বসান।
আহমেদ সেঞ্জার বিদ্রোহ দমন করে তার ভাইদের মৃত্যুর পরে আরো বেশকিছু সমস্যা প্রতিরোধ করে। এরপরে মোহাম্মদ তপারের পুত্র দ্বিতীয় মাহমুদ এর বিপরীতে ১১১৮ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনে আরোহন করেন। সুলতান আহমেদ সেঞ্জার যখন সিংহাসনে আরোহন করেন তখন সেলজুক সাম্রাজ্য মাটির সাথে মিশে যাবে এরকম অবস্থা। এই কঠিন সময়ে আহমেদ সেঞ্জার অক্লান্ত পরিশ্রম, সাহসীকতা ও ঈমানী শক্তি দিয়ে সেলজুক সাম্রাজ্যকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাড় করান এবং দীর্ঘ ৪০ বছর সম্রাজ্য শাসন করেন।
১০৯২ খ্রিস্টাব্দে মালিক শাহের মৃত্যুর পরে মালিক শাহের জয় করা অধিকাংশ অঞ্চল হারিয়ে ফেলে সেলজুক সাম্রাজ্য। দ্বিতীয়ত সেলজুক সাম্রাজ্য ধংস হওয়ার অন্যতম কারণ ছিলো কুখ্যাত হাসান সাব্বাহ কতৃক প্রতিষ্ঠিত গুপ্তঘাতক বাতেনী সম্প্রদায়। এই বাতেনীরাই ১০৯২ খ্রিস্টাব্দে সেলজুক সাম্রাজ্যের স্তম্ভ আবু আলী হাসান ইবনে আলী ইবনে ইসহাক আল তুসি বা নিজামুল মুলক কে হত্যা করে।
১১১৮ খ্রিস্টাব্দে আহমেদ সেঞ্জার যখন সিংহাসনে আরোহন করেন তখন মুসলিম উম্মাহ বাতেনী সম্প্রদায়ের অত্যাচারে অতিষ্ঠ। সিংহাসনে আরোহন করেই সুলতান আহমেদ সেঞ্জার বাতেনী সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে চিরুনি অভিযান পরিচালনা করেন এবং এতে তিনি সফল হন। তিনি হাশাশিনদের পারস্য থেকে নির্মূল করতে একটি অভিযান চালান এবং সফলভাবে কুহিস্তান ও তাবাস দূর্গ থেকে তাদেরকে বিতাড়িত করতে সফল হন। একপর্যায়ে হাসান সাব্বাহ দূর্গ থেকে পালিয়ে যান। একটি উপন্যাসে এমন রয়েছে যে, আলামুতে দুর্গে যাওয়ার পথে, আহমেদ সেঞ্জার এর পাশে মাটিতে একদিন একটি খঞ্জর বিদ্ধ হয়, যার মধ্যে লিখা ছিলো হাসান সাব্বাহ শান্তি চায়!! এই ঘটনায় হতবাক সানজার হাসানের কাছে দূত পাঠান এবং তারা উভয়েই একে অপরের পথ থেকে দূরে থাকতে সম্মত হন। পরবর্তীতে তারা আর কখনো একে অপরের মুখোমুখি হন নি।
৯ই সেপ্টেম্বর ১১৪১ সালে সমরখন্দের উত্তরে কাতওয়ানে সেলজুক সাম্রাজ্য ও কারা খিতাই রাজ্যের মধ্যে ঐতিহাসিক কাতওয়ানের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে সেলজুক সাম্রাজ্য পরাজিত হয় এবং একেবারে ভেঙ্গে পড়ে। এই যুদ্ধের বিবরণ বেশ কয়েকটি সূত্রে দেওয়া হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ সদর আল-দিন আল-হুসাইনির আরবি ক্রনিকল অফ দ্য সেলজুক-এ তিনি লিখেছেন যে আহমেদ সেঞ্জার এর আমিরদের মধ্যে "কোনও ঐক্যমত্য ছিল না"। তাই, যুদ্ধ শুরুর পরপরই, আহমেদ সেঞ্জার এর সৈন্যরা তাকে রেখে পিছু হটতে শুরু করে। আহমেদ সেঞ্জার মাত্র পনের জন অভিজাত ঘোড়সওয়ার নিয়ে পালিয়ে যান। এই যুদ্ধে পরাজয়ের পরে সির দারিয়ার (জাক্সার্টেস) পূর্বের সমস্ত অঞ্চল সেলজুকরা হারিয়ে ফেলেন ।
১১৫৩ সালে সেলজুকদের নিজস্ব গোত্র ঘুজ তুর্কিদের হাতে আরেকটি অপ্রত্যাশিত পরাজয়ের ফলে আহমেদ সেঞ্জার এর পাশাপাশি সেলজুকদের শাসনের পতন ঘটে। এই যুদ্ধে আহমেদ সেঞ্জার বন্দী হয়। এবং তিনি ১১৫৬ সাল পর্যন্ত বন্দী ছিলেন।
১১৫৭ সাথে বন্দীদশা থেকে পালিয়ে আসার সময় বাতেনী সম্প্রদায়ের হামলার শিকার হন সুলতান আহমেদ সেঞ্জার। আক্রমণ প্রতিহত করলেও সুলতান মারাত্মক ভাবে আহত হন। অবশেষে সেলজুক সাম্রাজ্যের এই সাহসী সুলতান হামলার কয়েকমাস পরে মৃত্যুবরণ করেন। মূলত তার মৃত্যুর মাধ্যমে সেলজুক সাম্রাজ্যের পরিসমাপ্তি হয়। সেলজুক সাম্রাজ্য ভেঙ্গে নতুন, নতুন রাজ্য সৃষ্টি হয়। সুলতান আহমেদ সেঞ্জার এর মৃত্যুর পরে সেলজুক সাম্রাজ্য ঘুরী সাম্রাজ্য, খোয়ারিজম সাম্রাজ্য, রোম সেলজুক সাম্রাজ্য, তারার সেলজুক সাম্রাজ্য, দামেস্কের সেলজুক সাম্রাজ্য, ইরাকের সেলজুক সাম্রাজ্যে বিভক্ত হয়ে যায়।

