"তোমরা (মুসলিমরা) অবশ্যই কন্সটান্টিনোপল বিজয় করবে। কতোই না অপূর্ব হবে সেই বিজয়ী সেনাপতি, কতোই না অপূর্ব হবে তার সেনাবাহিনী”।--- (মুসনাদে আহমদ)
..
দূর্ভেদ্য, অপরাজেয় কন্সটান্টিনোপল বিজয়ের ৫৭১ তম বছর পূর্তি হলো গত ২৯ মে ২০২৪ সালে। ১৪৫৩ সালের ২৯ মে উসমানীয় ৭ম ও তরুণ সুলতান দ্বিতীয় মেহমেদের নেতৃত্বে মুসলিমরা সুদীর্ঘ প্রতিক্ষার প্রহর শেষে বিজয়ীর সেনানীবেশে প্রবল পরাক্রম রোম/বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী কন্সটান্টিনোপলে প্রবেশ করেন। বিজয়ের বেশে সুলতান যখন দুর্ভেদ্য ও অপরাজেয় নগরীতে পদার্পণ করেন তখন তার বয়স ছিলো মাত্র ২১!!
..
তার আগে এই নগরীকে জয় করার জন্যে ইতিহাসে প্রসিদ্ধ ২২ জন সেনাপতি তাদের জীবনে ৩৩বার আক্রমণ করে বসেন রোম/বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী কন্সটান্টিনোপলে। কিন্তু একেএকে সব মহাপ্রতাপশালী সকল সেনাপতিই ব্যর্থ হন এই নগরীকে নিজেদের করায়ত্ত্ব করতে। অবশেষে সুদীর্ঘ প্রতীক্ষার প্রহর শেষে মাত্র ২১ বছর বয়সী একজন তরুণ সুলতানের কাছে ১হাজার বছরের উপরে অপরাজিত থাকা এই নগরীটি পদানত হয় উসমানীয় সাম্রাজ্যের কাছে। আর এর ফলে রোম/বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যেরও পতন ঘটে।
..
হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর মাধ্যমে পৃথিবীতে চূড়ান্তভাবে একত্ববাদী ধর্ম ইসলাম প্রতিষ্ঠা হলে তিনি মুসলমানদের জন্যে সুসংবাদ দিয়ে যান 'মুসলিমরা অবশ্যই কন্সটান্টিনোপল জয় করবে'। অতঃপর মুসলিমরা সর্বপ্রথম হযরত মুয়াবিয়া (রাঃ) এর শাসনামলে কন্সটান্টিনোপল জয় করার জন্যে ইয়াজিদ বিন মুয়াবিয়ার নেতৃত্বে সেনাবাহিনী নিয়ে বেড়িয়ে পড়ে। আর সেই দলে ইসলামী পতাকাবাহী ছিলেন বিখ্যাত সাহাবী আবু আইয়ুব আল আনসারী (রাঃ)। কিন্তু মুসলিমদের প্রথমবারের মতো কন্সটান্টিনোপল জয় করার অভিযান সম্পূর্ণরুপেই ব্যর্থ হয়ে যায়।
..
এরপরে উমাইয়া শাসনামলে আবারো দ্বিতীয়বারের মতো মুসলিমরা কন্সটান্টিনোপল জয় করার উদ্দেশ্যে ২ লক্ষের উপরে বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে রওয়ানা হন উমাইয়া খলিফা সুলাইমান বিন আব্দুল মালিক। কিন্তু এবারো ব্যর্থতার ষোলকলা পূর্ণকরে মুসলিম বাহিনি। প্রথম দুইবারের অভিযানে মুসলিম বাহিনি কন্সটান্টিনোপল জয় করা তো দুরে থাক এর ত্রিস্তর বিশিষ্ট থিওডোসিয়ান দেওয়ালের কাছেও ভিড়তে পারেনি। অতঃপর ইসলামের ৫ম খলিফা হিসেবে সর্বাধিক পরিচিত ওমর বিন আব্দুল আজিজ (রহ.) খলিফা নির্বাচিত হলে এই অভিযানের ইতি টানেন। এরপরে ৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে আব্বাসীয় খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হলে খলিফা হারুন অর রশিদ, খলিফা আল মামুন ও খলিফা প্রথম মুহতাসিম বিল্লাহ তারাও কন্সটান্টিনোপল জয় করার সংকল্প ব্যক্ত করেন কিন্তু তারা বড় কোনো অভিযান না চালিয়ে ছোট ছোট খন্ড আকারে আক্রমণ ও হামলা পরিচালনা করে। কিন্তু তাদের এসব কর্মপ্রচেষ্টাও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
..
শাসন ক্ষমতার পালাবদলে একেরপর এক আব্বাসীয় খলিফা আসে যায়। আব্বাসীয় দের দূর্বলতা,অযোগ্যতা ও বিলাসিত জীবনযাপনের সুযোগে মুসলিম দুনিয়াতে অনেক স্বাধীন সালতানাতের উৎপত্তি হতে থাকে। এরমধ্যে অন্যতম ও প্রবলক্ষমতাধর সেলজুক সালতানাত। মহান সেলজুক গাজীর পৌত্র ও মিকাইলের পুত্র তুঘরিল '১০৩৭ সালে সেলজুক সালতানাত' প্রতিষ্ঠা করেন। আর তার মাধ্যমেই ইসলামে তুর্কীদের উত্থান শুরু এরপরে ইসলামের জন্যে যতো জিহাদ, বিজয়,গৌরবময় ও মহিমান্বিত ইতিহাস ও জ্ঞানবিজ্ঞান সবই আসে তুর্কীদের হাত ধরে। ১০৩৭ থেকে শুরু ১৯২২ পর্যন্ত ইসলামকে সরাসরি নেতৃত্বই দিয়ে গেছে তুর্কীরা একেক সময় একেক রুপে কখনো সেলজুক, কখনো জেংকি, কখনো খোয়ারিজমি, কখনো খিলজি, কখনো বাহরী মামলুক এবং সর্বশেষ উসমানী।
..
অতঃপর সেলজুক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হলে মালাজগির্টের মহানায়ক সুলতান আল্প আরসালান তার জীবনে কন্সটান্টিনোপল জয় করার জন্যে দৃঢ়প্রত্যয়ী হন কিন্তু আকস্মিক মুত্যুতে তা আর বাস্তবায়ন করতে পারেনি কিন্তু তিনি তার পুত্র মালিক শাহ কে বলে যান সে যেনো কন্সটান্টিনোপলের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন সেনাবাহিনী নিয়ে অতীদ্রুত...পিতার মতো পুত্র মালিক শাহও তার জীবনে সালতানাতের ভিতরে ব্যস্ততা ও কোন্দল দমন করে শান্তি ও স্থীতিশীলতা বজায় রাখায় মনোযোগী হওয়াতে তিনিও কন্সটান্টিনোপল জয় করার জন্যে সেনাবাহিনী প্রস্তত করতে পারেনি। এরপরে সুলতান মালিক শাহের অপূরণীয় আকস্মিক মুত্যুতে মুসলিমদের উপরে ক্রুসেড ঝড় বয়ে যায়...লণ্ডভণ্ড হয় সমগ্র শাম ও পবিত্র ভূমি জেরুজালেম। এরপরে সুলতান কিলিচ আরসালান কন্সটান্টিনোপল অবরোধ করেন এবং ঝটিকা আক্রমণেই সীমাবদ্ধ থাকেন।
..
এরপরে একইসাথে মুসলিমদের উপর বয়ে যায় ইউরোপীয় সম্মিলিত খ্রিষ্টানদের করা রক্তক্ষয়ী ধর্মযুদ্ধ ক্রুসেড। ক্রুসেডের ডামাডোল থামতে না থামতেই আবার পৃথিবীর বুকে নেমে আসে দুঃসাহসী ও অভিশপ্ত মোঙ্গলদের অমানবিক বর্বরোচিত নৃশংস হত্যাকান্ড। যার দরুন অবস্থাতে সমগ্র চীন,সমগ্র মধ্যএশিয়া,আনাতোলিয়া,শাম,ইরাক,ককেশাস অঞ্চল সমূহ ধ্বংসাত্বক ভূমিতে পরিণত হয়ে পদানত হয় মোঙ্গলদের কাছে।
..
অতঃপর মোঙ্গলদের তাণ্ডবে তাড়া খেয়ে আধুনিক তুর্কিমিনিস্তান ও উজবেকিস্তান থেকে মহান অঘুজ খানের কিছু কিছু গোত্র রোম সেলজুক ও আইয়ুবি সালতানাতের দিকে হিজরত শুরু করে এরমধ্যে অন্যতম হলো কায়ী উপজাতি। এই গোত্রের আর্তুগ্রুল গাজীর সন্তান উসমান গাজী ১২৯৯ সালে নিজের নামে যে বেইলিক বা স্বাধীন গাজী রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন সেটিই পৃথিবীর ইতিহাসে ৩ মহাদেশে রাজ্যবিস্তার করা মহাপ্রতাপশালী উসমানী সাম্রাজ্য। উসমান গাজী স্বপ্ন দেখেন তার গঠিত ছোট বেইলিকটা একদিন 'নীল-ফোরাত-দানিউব' নদী পর্যন্ত বিস্তার লাভ করবে এবং এর রাজধানী হবে সয়ং কন্সটান্টিনোপল!!! তাইতো তিনি শুরু থেকেই অত্যন্ত দৃঢ়প্রত্যয়ী হয়ে এই স্বপ্ন বাস্তবে মনোযোগ... তার পুত্র উরহান গাজী সেই স্বপ্নকে আরো করেন এরপরে তার পুত্র প্রথম মুরাদ খোদাওয়ান্দিগার সেটাকে আরো বড় আকারে বিস্তৃতি করান....
..
অতঃপর সুলতান বায়েজিদ ইলদিরিমের মাধ্যমে আবারো মুসলিমরা সরাসরি কন্সটান্টিনোপল জয় করার তীব্র সংকল্পবোধ করে এই নগরীকে অবরোধ করে বসেন। প্রথমবারে অবরোধ করে তেমন কোনো সফলতা না পাওয়াতে অবরোধ তুলে নেন এবং দ্বিতীয় বারের মতো আবারো ১৪০০ সালে কন্সটান্টিনোপল অবরোধ করেন। কিন্তু অন্যদিকে চলছে পৃথিবীর আরেক নৃশংস মানব লুণ্ঠন ও হত্যাকারী তৈমুর লংএর তাণ্ডব। সুলতান বায়েজিদ ইলদিরিম কন্সটান্টিনোপলের অবরোধ তুলে নিয়ে তৈমুর লং এর বিরুদ্ধে আংকারা প্রান্তরে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। যুদ্ধে সুলতান বায়েজিদ পরাজিত ও বন্দী হন। তারপরের ইতিহাস অত্যন্ত করুণ ও ভয়াবহ। গৃহযুদ্ধের বেড়াজালে বন্দি উসমানীয় রাজবংশ!!! সেখান থেকে কোনোমতে প্রথম মেহমেদ সাম্রাজ্য কে আবারো একত্রিত করে নতুন করে গড়ে তুলেন। তার পুত্র মুরাদ ক্ষমতাতে এসেই আবারো দাদা বায়েজিদ ইলদিরিমের মতো কন্সটান্টিনোপল অবরোধ করেন। কিন্তু ফলাফল প্রতিবারই ব্যর্থতার ষোলআনা পরিপূর্ণ।
..
এরপরে যিনি কন্সটান্টিনোপল জয় করার সংকল্পবোধ করেন ছোট থেকে তিনিই সেই ব্যাক্তি যিনি হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর হাদিসের সত্যায়নকারী এবং ১হাজার বছরের উপরে অপরাজিত থাকা দূর্ভেদ্য বাইজান্টাইন নগরী কন্সটান্টিনোপলের পতনকারী ' ফাতিহ সুলতান মেহমেদ খান'। ইতিহাসকে যিনি নিজের করে নিয়েছেন অতি আপন করে এবং বাইজান্টাইনদের গর্ব,অহংকারকে চূর্ণ বিচূর্ণ করে নিজের মতো করে জৌলুষময় স্বর্ণাক্ষরে ইতিহাস রচিত করেন।
..
১৪৫৩ সালের ২৯ মে উসমানীয় ৭ম শাসক ফাতিহ সুলতান দ্বিতীয় মেহমেদ বা সুলতান মুহাম্মদ আল ফাতিহ কন্সটান্টিনোপল (ইস্তাম্বুল) বিজয় করে একে উসমানী সাম্রাজ্যের রাজধানী করে নতুন করে নাম রাখেন ইসলামবুল বা ইসলামের ঘর। এরপর থেকেই দ্বিতীয় বায়েজিদ, ইয়াভুজ সেলিম,কানুনি সুলাইমান,প্রথম আহমেদ, চতুর্থ মুরাদ ও চতুর্থ মেহমেদরা একচেটিয়া ও একক আধিপত্য বলয়ে পৃথিবীর প্রধান ৩ মহাদেশ গৌরবান্বিত করে শাসন করে যায় অন্ততপক্ষে ১৭ শতক পর্যন্ত। পতনোন্মুখ যুগেও এসে দ্বিতীয় মাহমুদ, প্রথম আব্দুল মজিদ,দ্বিতীয় আব্দুল আজিজ ও দ্বিতীয় আব্দুল হামিদরাও জানান দেয় তারা কাদের বংশধর ও উত্তরসূরি ছিলো।🥰💗
#কনস্টান্টিনোপল
....
৩৩০ খ্রিস্টাব্দে রোমান সম্রাট কনস্টান্টিন বসফরাস প্রণালীর উপকূলে কনস্টান্টিনোপল শহর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ৩৯৫ সালে রোমান সাম্রাজ্য দু’ভাগ হলে পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের নাম হয় বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য। যার রাজধানী হয় কনস্টান্টিনোপল। পশ্চিমে রোমের পতন হলেও পূর্বে রোমান সাম্রাজ্যের ধারক হিসেবে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের পতাকাতলে টিকে ছিল কনস্টান্টিনোপল। কনস্টান্টিনোপল অনেকবার শত্রুদের আক্রমণের শিকার হলেও এগারো শতাব্দীর ইতিহাসে মাত্র একবারই এ শহর জয় করা সম্ভব হয়েছিল, ১২০৪ সালের চতুর্থ ক্রুসেডে।
....
ত্রিকোণাকার এ শহরের উত্তরে বসফরাস প্রণালীর অংশ গোল্ডেন হর্ন, পূর্বে বসফরাস প্রণালীর মূল অংশ এবং দক্ষিণে মারমারা সাগর। এছাড়াও রয়েছে শহরকে ঘিরে রাখা অসংখ্য নগর প্রতিরক্ষা দেয়াল। এগুলোর মধ্যে রয়েছে থিওডেসিয়ান দেয়াল, যা প্রায় অজেয় এক নগর প্রতিরক্ষা দেয়াল। ফলে প্রাকৃতিকভাবেই নিরাপত্তা পেয়ে যেত কনস্টান্টিনোপল। মুসলিমরাও বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেছে এ শহর বিজয়ের। শুরুটা হয়েছিল বেশ আগেই, উমাইয়া খলিফা হযরত মুয়াবিয়া (রাঃ) এর হাত ধরে। কিন্তু তার অভিযান থেমে গিয়েছিল শহরের প্রাচীরের কাছেই। উসমানীয় সুলতান বায়োজিদও চেষ্টা করেছিলেন এ শহর বিজয়ের জন্য, কিন্তু ব্যর্থ হয়েছিলেন তিনিও।
....
এতো ব্যর্থতার পরেও উসমানীয় সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদ (তুর্কী ভাষায় মেহমেদ) সিদ্ধান্ত নেন কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের। ১৪৫১ সালে মাত্র ১৯ বছরে সিংহাসনে বসা সুলতানকে শুরুতে তার দেশের লোকেরাই খুব একটা পাত্তা দেয়নি, সেখানে আশেপাশের অন্য সাম্রাজ্যরা তাকে কোনো হুমকি হিসেবেই গণ্য করেনি। তাকে অবহেলা করার কারণও আছে। এর আগেও একবার সিংহাসনে বসেছিলেন তিনি। মাত্র বারো বছর বয়সে তার বাবা তাকে সিংহাসন ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু বহিঃশত্রুর আক্রমণের কারণে তিনি তার বাবাকে নির্দেশ দেন সিংহাসন ফিরিয়ে নিতে। এ কারণে অনেকেই তাকে দুর্বল ভাবত।
....
এ অবহেলার সুযোগটাই নেন সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদ। এছাড়াও সে সময় থেকে ইউরোপের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও তাকে এ সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহ দিয়েছিল। ইউরোপের দুই পরাশক্তি ফ্রান্স আর ইংল্যান্ড নিজেদের মধ্যে যুদ্ধে লিপ্ত ছিল প্রায় একশ বছরেরও বেশি। এ যুদ্ধ ইতিহাসে ‘একশ বছরের যুদ্ধ’ নামে পরিচিত। এছাড়াও সে সময়ের অন্যান্য পরাশক্তি স্পেন, জার্মানি, পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি নিজেদের বিভিন্ন যুদ্ধে জড়িত ছিল। এসব যুদ্ধের কারণে ইউরোপের সেনাবাহিনী বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছিল। এর সুযোগ নিতে চেয়েছিলেন দ্বিতীয় মুহাম্মদ।
....
এক সময়ের প্রতাপশালী বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যও তার জৌলুশ হারিয়ে ফেলেছিল সে সময়ে। ল্যাটিন, সার্বিয়া, বুলগেরিয়ার কাছে রাজ্যের অনেক জায়গাই হাতছাড়া হয় বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছিল উসমানীয় সাম্রাজ্যই। প্রায় সবদিক থেকে ঘিরে ফেলেছিল কনস্টান্টিনোপলকে। চতুর্দশ শতকের প্লেগে শহরের প্রায় অর্ধেক মানুষ মারা যায়। ফলে অর্থনৈতিক এবং সামরিক উভয় দিক থেকেই দুর্বল হতে থাকে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য। সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদ যখন সিংহাসনে বসেন তখন বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য বলতে টিকে ছিল শুধুমাত্র কনস্টান্টিনোপল শহর, মারমারা সাগরে প্রিন্স আইল্যান্ড এবং পেলোপন্সে।
....
সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদ তাড়াহুড়ো করে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েননি। তিনি প্রতিটি পদক্ষেপ নিয়েছিলেন অল্প অল্প করে। এর মধ্যে ছিল ১৪৫২ সালে সুলতান মুহাম্মদ বসফরাসের পশ্চিম দিকে "রুমেলিহিসারি" দুর্গ নির্মাণের নির্দেশ দেয়। এর আগে তার প্রপিতামহ প্রথম ইয়িলদিরিম বায়েজিদ খান বসফরাসে "আনাদোলুহিসারি" দুর্গ নির্মাণ করেছিলেন। তবে ইয়িলদিরিম বায়জিদ খানের দুর্গ ছিল এশিয়ায় আর সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদের দুর্গ ছিল ইউরোপে। দুর্গ দু’টি উসমানীয় সাম্রাজ্যকে বসফরাস প্রণালীর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এনে দেয়। কারণ এই দুই দুর্গ এড়িয়ে বসফরাস প্রণালী পার করা সম্ভব ছিল না। ফলে সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর আগেই বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের অর্থনীতিতে আঘাত হানেন সুলতান। সে বছরের অক্টোবরেই সুলতান তুরাখান বেগকে পেলোপন্সে বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে যাবার নির্দেশ দেন, যাতে পেলোপন্সে কনস্টান্টিনোপল শহরে কোনো সাহায্য পাঠাতে না পারে।
....
সেসময় বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সিংহাসনে ছিলেন একাদশ কন্সটানটিন। তিনি সহজেই মুহাম্মদের চাল বুঝতে পারেন। ক্রমেই ছোট হয়ে আসা বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের কফিনে শেষ পেরেক পড়ার ভয়ে সম্রাট সাহায্য চান পশ্চিমে ইউরোপের দেশগুলোর কাছে। কিন্তু কয়েক শতাব্দী ধরে চলে আসা শত্রুতা এবং পূর্বের অর্থোডক্স চার্চ ও পশ্চিমের ক্যাথোলিক চার্চের দ্বন্দ্ব বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় ঐক্যবদ্ধ সাহায্য পাবার পথে। শেষ পর্যন্ত কোনো উপায় না পেয়ে পূর্ব অর্থোডক্স চার্চ রাজি হয় পশ্চিমের ক্যাথোলিক চার্চের সাথে একতাবদ্ধ হবার ব্যাপারে। পোপের কাছে প্রস্তাবও পাঠায় এ ব্যাপারে।
....
বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য ভেবেছিল ইউরোপের অন্যান্য দেশের উপরে পোপের ভালো নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। কিন্তু তাদের ধারণা ছিল ভুল। নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করে দুর্বল হয়ে যাওয়া দেশগুলো বাইরের কোনো দেশের জন্য যুদ্ধ করতে সহজে রাজি হয়নি। শেষে পোপ পুরো ব্যাপারটিকে ধর্মযুদ্ধের মতো করে দেখানোয় মুসলিমদের থামাতে একতাবদ্ধ হয় খ্রিস্টান সেনাবাহিনী। ইউরোপের বিভিন্ন জায়গা থেকে কিছু সাহায্য পেতে থাকে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য, তবে একেবারেই নগন্য। অনেকে নিজ উদ্যোগে ২০০-৪০০ জনের বাহিনী নিয়ে যোগ দেয় কন্সটান্টিপোল রক্ষার জন্য। এদের মধ্যে ছিলেন জেনোয়া থেকে আসা জিওভানি জিউসটিনিয়ানি। নগর রক্ষা দেয়াল প্রতিরক্ষার ব্যাপারে তিনি বেশ অভিজ্ঞ ছিলেন। ১৪৫৩ সালের জানুয়ারিতে তিনি শহরে পৌঁছানোর পরেই দেয়াল প্রতিরক্ষার মূল সেনাপতি হিসেবে নিয়োগ পান।
....
ভেনিস আনুষ্ঠানিকভাবে কন্সটান্টিনকে সাহায্য করার ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত না নিলেও গোল্ডেন হর্নে অবস্থান করা ভেনিসিয়ান নাবিকরা শহর রক্ষার জন্য সম্রাটের পক্ষে অবস্থান নেয়। মার্চের শেষের দিকে পোপের নির্দেশে তিনটি জাহাজ যাত্রা করে কন্সটান্টিনোপল রক্ষার জন্য। ভেনিস শেষ পর্যন্ত কন্সটান্টিনোপলকে সাহায্যের সিদ্ধান্ত নেয়। ভেনিস ফেব্রুয়ারিতে নৌবাহিনী পাঠাতে চাইলেও বিভিন্ন কারণে দেরি হওয়াতে নৌবাহিনীর যাত্রা শুরু হয় এপ্রিলে। নৌ আক্রমণ প্রতিরোধের জন্য সম্রাট কন্সটান্টিন পোতাশ্রয়ের মুখে কাঠের গুড়ি দিয়ে প্রতিরক্ষা চেইন নির্মাণ করেন। স্থলপথে উসমানীয় বাহিনীকে আটকানোর জন্য দেয়াল মেরামতের কাজও শুরু করা হয়।
....
উসমানীয়দের সেনাবাহিনী ছিল অনেক বড়, প্রায় পঁচাত্তর হাজার থেকে এক লক্ষের মতো সেনাসদস্য ছিলো তাদের। অন্যদিকে বাইজেন্টাইনদের সেনাবাহিনী ছিল অনেক ছোট, মাত্র আট হাজার জনের মতো। বাইজেন্টাইনদের সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল তাদের প্রায় অজেয় প্রতিরক্ষা দেয়াল। তবে দুশ্চিন্তার কারণও ছিল তাদের, কেননা অরবান নামক এক প্রকৌশলীর তৈরি করা এক বিশাল কামান। মজার ব্যাপার হলো, ধর্মযুদ্ধের রূপ নেয়া এ যুদ্ধে এই কামানের বেশ বড় ভূমিকা ছিল, যা তৈরি করেছিল এক খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী। এই কামান কন্সটান্টিনোপলের দেয়ালের জন্য ছিল এক বড় হুমকি। মারমারা সাগরে উসমানীয়দের বিশাল নৌবাহিনীও প্রস্তুত ছিল জলপথে আক্রমণের জন্য। বসফরাস প্রণালীর উপকূলে এশিয়া অংশে "আনাদোলুহিসারি" এবং ইউরোপীয় অংশে "রুমেলিহিসারি" দুর্গ বাইজেন্টাইনদের নৌপথে চলাচল সীমিত করে দিয়েছিল।
....
১৪৫৩ সালের ১ এপ্রিল থেকে উসমানীয় সেনাবাহিনী কন্সটান্টিনোপলের চারিদিকে অবস্থান নেয়া শুরু করে। চারদিন পর ৫ এপ্রিল সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদ যোগ দেন সেনাবাহিনীর সাথে, এবং ঠিক পরের দিন অর্থাৎ ৬ এপ্রিল শুরু হয় কন্সটান্টিপোল বিজয়ের যুদ্ধ। শুরুতেই শহরের বাইরে থাকা বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের শক্তিশালী চৌকিগুলো দখল করে নেয় উসমানীয় বাহিনী। এরপরই উসমানীয় বাহিনী নগরের থিওডেসিয়ান দেয়ালে কামানের গোলা বর্ষণ শুরু করে। কিন্তু কামানের দু’টি গোলা নিক্ষেপের মধ্যবর্তী সময় ছিল তিন ঘন্টার মতো। ফলে একবার গোলা বর্ষণে যে ক্ষতি হতো, বাইজেন্টাইনরা সহজেই সেই ক্ষতি মেরামত করে ফেলতো। ফলে ওসমানীয় সাম্রাজ্য বলার মতো কোনো সাফল্যের মুখ দেখেনি প্রথম কয়েকদিনে।
....
অন্যদিকে জলপথে সুলাইমান বাল্টোঘলুর নেতৃত্বাধীন উসমানীয় সাম্রাজ্যের নৌবাহিনী ছিল বিপর্যস্ত। গোল্ডেন হর্নে দেয়া চেইনের কারণে তারা বেশিদূর এগোতে পারেনি। সবচেয়ে লজ্জাজনক ছিল যখন ২০ এপ্রিল বাইজেন্টাইন সাম্রাজকে সাহায্য করার জন্য আসা চারটি জাহাজ প্রায় একশটি উসমানীয় জাহাজকে বোকা বানিয়ে লক্ষ্যস্থলে পৌঁছে যায়। কিন্তু নৌবাহিনীকে গোল্ডেন হর্নে পৌঁছানোর ব্যাপারে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ সুলতান মুহাম্মদ নির্দেশ দেন জাহাজের তলদেশে কাঠের গুড়ি লাগিয়ে স্থলপথে ঘুরিয়ে গোল্ডেন হর্নে নিয়ে যাবার। অমানবিক পরিশ্রমের পর উসমানীয় নৌবাহিনী চেইনের পেছনের জলপথে পৌঁছায়। ২৮ এপ্রিল সম্রাট কন্সটান্টিন এই নৌবাহিনীকে আক্রমণের জন্য নৌবাহিনী পাঠান। কিন্তু আগে থেকেই খবর পেয়ে যাওয়ায় উসমানীয় নৌবাহিনী প্রস্তুত ছিলো। ফলে সহজেই বাইজেন্টাইন নৌবাহিনীকে পরাজিত করে। ফলে গোল্ডেন হর্নের দিকে দেয়াল রক্ষার জন্য সম্রাট কন্সটান্টিনকে নতুন করে লোক নিয়োগ দিতে হয়।
....
অন্যদিকে থিওডেসিয়ান দেয়ালে কামানের গোলা বর্ষণে কোন কাজ না হওয়ায় সুলতান নতুন পদক্ষেপ নেন। জাগানোস পাশা এবং সার্বিয়ান সৈন্যদের নেতৃত্বে সুড়ঙ্গ তৈরি করা শুরু হয়। উদ্দেশ্য ছিল সুড়ঙ্গ দিয়ে সেনা নিয়ে দেয়াল না ভেঙেই মূল শহরে আক্রমণ করা। উসমানীয়দের নতুন কৌশল ধরতে পেরে বাইজেন্টাইন প্রকৌশলী জোহানসন গ্রান্ট পাল্টা আক্রমণ করেন। ১৮ মে গ্রান্টের নেতৃত্বে প্রথম সুড়ঙ্গ দখল করে বাইজেন্টাইনরা। এরপর ২১ এবং ২৩ মে আরো দু’টি সুড়ঙ্গের পাশাপাশি দুইজন ওসমানীয় অফিসারকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় তারা। অত্যাচার করে তাদের কাছ থেকে অন্যান্য সুড়ঙ্গের অবস্থান জেনে সবগুলো ধ্বংস করে দেয় ২৫ মে। ফলে উসমানীয়দের এই পরিকল্পনাও নস্যাৎ হয়ে যায়।
....
দীর্ঘদিন ধরে কোনো সফলতা না পাওয়ায় উসমানীয় বাহিনী একদিকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছিল, অন্যদিকে গ্রান্টের সাফল্য পাবার পরেও বাইজেন্টাইনরাও মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছিল। ভেনিস থেকে সাহায্য আসা সম্ভব না ততোদিনে বুঝে গিয়েছিল তারা। এছাড়াও ২৬ মে ঘন কুয়াশা শহরের অনেকের মনে বিভিন্ন কুসংস্কারের জন্ম দেয়। শহরের অনেকেই ধরে নেয় হাজিয়া সোফিয়া থেকে পবিত্র আত্মার চলে যাওয়া লুকাতেই এই কুয়াশা হয়েছিল।
....
অন্যদিকে ক্লান্ত, বিধ্বস্ত সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদ ২৬ মে রাতে তার সেনাপতিদের সাথে আলোচনায় বসেন। সিদ্ধান্ত হয় ২৮ মে রাতে বিশ্রাম এবং নামাজের পর বড় একটি আক্রমণ চালানো হবে। ২৮ মে মাঝরাতের পর পর উসমানীয় বাহিনী আক্রমণ শুরু করে। প্রথমদিকে কিছু সাফল্য পাবার পর উসমানীয়দের এলিট ফোর্স জ্যানিসারিরা যোগ দেয় আক্রমণে। কিন্তু জিওভানি জিউসটিনিয়ানির নেতৃত্বে তাদের আটকে রাখে বাইজেন্টাইন সেনারা।
....
উসমানীয় বাহিনীর আক্রমণে জিউসটিনিয়ানি আহত হলে তার শুশ্রুষার জন্য তাকে শহরের ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপরই প্রতিরক্ষা দুর্বল হতে থাকে বাইজেন্টাইনদের। উসমানীয়রা বাইজেন্টাইনদের প্রতিরক্ষা ভেদ করে ধীরে ধীরে ভেতরে প্রবেশ শুরু করে। দক্ষিণ দিকে সম্রাট কন্সটান্টিন নিজেই দেয়াল প্রতিরক্ষায় নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। কিন্তু উত্তর দিকের একটি প্রবেশদ্বার উসমানীয়রা খুলে ফেলায় তিনি চাপে পড়ে পিছিয়ে যেতে থাকেন। একই সময়ে উসমানীয়রা আরো কিছু প্রবেশদ্বার খুলে দলে দলে শহরে ঢুকে পড়তে থাকে। সম্রাট কন্সটান্টিনের ভাগ্যে শেষ পর্যন্ত কি হয়েছিল তা জানা না গেলেও, ধারণা করা হয় উসমানীয় বাহিনীকে শেষবারের মতো আটকে দেবার প্রচেষ্টায় মারা যান তিনি।
....
বাইজেন্টাইনদের প্রায় চার হাজার সেনা মারা যায়, অন্যদিকে উসমানীয়দের হতাহতের সংখ্যা জানা যায়নি। দীর্ঘদিন অজেয় থাকা কন্সটান্টিনোপল শহর ১৪৫৩ সালের ২৯ মে দখল করে নেয় উসমানীয় সাম্রাজ্য। আসল রোমের পতন ঘটলেও রোমান সাম্রাজ্যের জৌলুশের ছায়া হয়ে থাকা বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যেরও পতন ঘটে সেদিন। হাজার বছর ধরে চলে আসা রোমান সাম্রাজ্যের পতনের সাক্ষী হয়ে থাকে উসমানীয় বাহিনীর এ বিজয়।
....
মুসলিমদের কাছে যা কন্সটান্টিনোপল বিজয়, খ্রিস্টানদের কাছে তা ছিল কন্সটান্টিনোপলের পতন। সেসময় পোপ উসমানীয়দের বিরুদ্ধে ধর্মযুদ্ধের ডাক দিয়ে কন্সটান্টিনোপল ফিরে পাবার আহ্বান জানান। কিন্তু ইউরোপের কেউই কোনো আগ্রহ দেখায়নি কন্সটান্টিপোল ফিরে পাওয়ার ব্যাপারে। সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদ উসমানীয় সাম্রাজ্যের রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেন কন্সটান্টিনোপলে। প্রাচীন এ শহরকে কেন্দ্র করেই উসমানীয় সাম্রাজ্য পরবর্তীতে বিস্তৃত করে তাদের সাম্রাজ্য। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের মাধ্যমে পতন ঘটে এই উসমানীয় সাম্রাজ্যের।
....
উসমানীয়দের এই বিজয় ইউরোপের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। এশিয়ার সাথে সরাসরি বাণিজ্যের পথ হারায় ইউরোপিয়ানরা। ফলে তারা পূর্ব দিক দিয়ে ভারত কিংবা চীনে যাবার রাস্তা খুঁজতে থাকে। সেগুলো আবার জন্ম দেয় নতুন সব অভিযানের। মাত্র একুশ বছর বয়সে প্রায় অজেয় এক শহর বিজয় করে সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদ উপাধি পান ‘মুহাম্মদ আল-ফাতিহ’ বা ‘বিজয়ী’। এই বিজয়ী সুলতানকে নিয়ে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) অনেক আগেই ভবিষ্যৎবাণী করে গিয়েছিলেন।
....
তোমরা (মুসলিমরা) অবশ্যই কন্সটান্টিনোপল বিজয় করবে। কতোই না অপূর্ব হবে সেই বিজয়ী সেনাপতি, কতোই না অপূর্ব হবে তার সেনাবাহিনী”। (আহমাদ আল-মুসনাদ ১৪:১৩১)

