#পাসিনলারের_যুদ্ধ
#পর্ব_০১
১০৪৮ খ্রিস্টাব্দ, বর্তমান উত্তর-পূর্ব তুরস্কের পাসিনলার ময়দানে সংঘটিত হয় বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য ও সেলজুক সাম্রাজ্যের মাঝে এক মহাযুদ্ধ। ইতিহাসে যা কাপেট্রোন বা পাসিনলারের যুদ্ধ নামে পরিচিত। সুলতান মোহাম্মদ আল্প আরসালানের জীবনের উপর নির্মিত আল্প আরসালান বুয়ুক সেলজুক সিরিজ শুরু হয় এই যুদ্ধ-দৃশ্যের মাধ্যমে।
কেমন ছিল ইতিহাসে পাসিনলারের সেই ময়দান? সিরিজে দেখানো পাসিনলার থেকে ইতিহাসের পাসিনলারে আজ একটু ঘুরে আসার চেষ্টা করব।
পটভূমিঃ
সেলজুক সাম্রাজ্য বর্তমান ইরানের অঞ্চলগুলি জয় করার পর, ১০৪০ এর দশকের শেষের দিকে প্রচুর সংখ্যক ওঘুজ তুর্কি গোত্র আর্মেনিয়ার বাইজেন্টাইন সীমান্তে এসে পৌঁছায়। এই গোত্রগুলো সেলজুক শাসকদের নামমাত্র আনুগত্য করতো। যখন সেলজুকদের লক্ষ্য ছিল একটি সুশৃঙ্খল প্রশাসনের সাথে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা, তখন তুর্কী গোত্রগুলো বিভিন্ন জায়গায় হামলা, লুণ্ঠন এবং নতুন চারণভূমি দখলে বেশি আগ্রহী ছিল এবং এজন্য স্বাধীনভাবে বিভিন্ন বাইজেন্টাইন গ্রাম বা দুর্গে হামলা চালাতো।
১০৪৫ সালের দিকে সেলজুক সুলতান তুঘরিল বেগের চাচাতো ভাই কুতালমিশ কর্তৃক পূর্ব বাইজেন্টাইন প্রদেশ ভাসপুরকানের বিরুদ্ধে প্রথম বড় আকারের অভিযান চালানো হয়। কুতালমিশ বেগ স্থানীয় বাইজেন্টাইন কমান্ডার স্টিফেন লেইচৌডেসকে পরাজিত ও বন্দী করেন। [1]
এর কাছাকাছি সময়েই সুলতান তুঘরিলের এক ভাতিজা হাসান বেগের অধীনে আরেকটি বড় অভিযান শুরু হয়, কিন্তু ভাসপুরাকান হয়ে ফিরে আসার সময় হাসানের বাহিনী স্থানীয় বাইজেন্টাইন কমান্ডারদের দ্বারা হামলার শিকার হয়, যাদের মধ্যে অ্যারন ও কাতাকালন কেকাউমেনোস অন্যতম। এই হামলায় হাসান বেগ পরাজিত ও শহীদ হোন। [2]
এরপর হাসান বেগের পরাজয়ের প্রতিশোধ নেয়ার এবং বাইজেন্টিয়ামের শক্তি বোঝার জন্য ১০৪৮ সালের গ্রীষ্মে তুঘরিল বেগের সৎ ভাই ইবরাহিম ইনাল বেগের নেতৃত্বে আনাতোলিয়ায় একটি সামরিক অভিযান চালানো হয়। এই অভিযানে সেলজুক মূল বাহিনীর সাথে ওঘুজ তুর্কী গোত্রগুলো এবং খোরাসানী ইরানী অনেক সৈন্য যোগ দেয়। [3]
এ সময় বাইজেন্টাইন বাহিনী সেলজুকদের থেকে সংখ্যায় অনেক বেশী থাকলেও অ্যারন এবং কেকাউমেনোস নিজেদের দ্বন্দ্বে সময়ক্ষেপণ করেন এবং পরবর্তীতে সম্রাট নবম কনস্টানটাইনের নির্দেশে শক্তিবৃদ্ধি না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে থাকেন। এই অভিযানে সেলজুক বাহিনী একে একে ২১টি অঞ্চল জয় করে। এর মধ্যে একটি ছিলো বাইজেন্টিয়ামের একটি অত্যন্ত সক্রিয় বাণিজ্য কেন্দ্র "আরজেন/আর্টে" শহর; যা সেলজুকরা দখল করে পুড়িয়ে দেয়। [4]
ওদিকে সম্রাট জর্জিয়ান সেনাপতি লিপারিতকে তার নিজস্ব বাহিনী নিয়ে বাইজেন্টাইন বাহিনীকে সাহায্যের আহ্বান জানান। এভাবে জেনারেল কেকাউমেনোস, অ্যারোনিওস এবং জর্জিয়ানদের প্রায় ৫০,০০০ থেকে ৭৫,০০০ সৈন্যের একটি বাইজেন্টাইন-জর্জিয়ান সম্মিলিত বাহিনী লিপারিতের নেতৃত্বে একত্রিত হয়; যাদের লক্ষ্য ছিল সেলজুক ও স্থানীয় ওঘুজ তুর্কী গোত্রগুলোকে নির্মূল করা।
এরপর… আচ্ছা থাক, যুদ্ধের বাকি আলোচনা আরেকদিন করা যাবে। এখন বরং একটু সিরিজের দিকে নজর দেয়া যাক,
[1] প্রথম লক্ষণীয় যে, সিরিজে দেখানো হয়েছে কেকাউমেনোসের পুত্র তুর্কি গোত্রগুলোতে হামলা করে হত্যাযজ্ঞ চালানোতে সুলতান যুদ্ধের নির্দেশ দেন; যদিও পাসিনলারের পটভূমিতে এমন কোন ঘটনার কথা উল্লেখ পাওয়া যায় না। অবশ্য এই সীমান্ত অঞ্চলগুলোতে সবসময়ই তুর্কি গোত্র এবং বাইজেন্টাইন ও আর্মেনীয় খ্রিস্টানদের মাঝে যুদ্ধ-লড়াই লেগে থাকতো। এর কারণ হিসেবে যেমন বাইজেন্টাইনদের জুলুম রয়েছে, তেমনি তুর্কি গোত্রগুলোর ভূমি প্রসারণ ও লুটবৃত্তি মানসিকতাকেও কারণ হিসেবে বলা যায়।
[2] আল্প আরসালান বুয়ুক সেলজুকে দেখানো হয় সুলাইমানের সাথে যুদ্ধের ময়দান পূর্ব পরিদর্শনে গিয়ে অতর্কিত হামলার শিকার হয়ে হাসান বেগ শহীদ হোন। এই ঘটনাটা অনেকটা ঐতিহাসিকই বলা চলে, তবে পরিচালক সিরিজে কিছুটা অন্যরকম ভাবে দেখিয়েছেন। মূলত যুদ্ধের ময়দান পরিদর্শনে নয়, পাসিনলারের পূর্বে হাসান বেগ এক বড় বাহিনী নিয়ে অভিযানের সময় এদিকে অতর্কিত হামলার শিকার হোন, যা পাসিনলার যুদ্ধের অন্যতম কার্যকারণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
[3] এছাড়া সিরিজে যেমন দেখানো হয়েছে পাসিনলার একটি একক যুদ্ধ, মূলত বিষয়টি তেমন ছিল না। বরং এটি একটি বড় অভিযানের অংশ ছিল, এর মাঝে বাইজেন্টাইনরা প্রতিরোধ করতে চাইলে পাসিনলার প্রান্তরে উভয় পক্ষের মুখোমুখি লড়াই হয়।
[4] পাসিনলারের যুদ্ধের পূর্বে এই অভিযানে সেলজুকরা ২১টি শহর জয় করলেও সিরিজে তা দেখানো হয়নি বা দেখানো সম্ভব হয়নি।
যাই হোক, যারা সিরিজ দেখেন শুধুই বিনোদনের জন্য তারা যেভাবে ইচ্ছা দেখতে পারেন, তবে আমরা যারা ইতিহাস জানার সহায়ক ক্ষেত্র হিসেবে সিরিজ দেখি, তারা প্রতিটি বিষয়ে ইতিহাসের সাথে এভাবে মিলিয়ে দেখলে এবং বুঝলে ইতিহাসের এই অধ্যায়গুলো সম্বন্ধে আমাদের খুব ভালো ধারণা তৈরি হবে।
#পাসিনলারের_যুদ্ধ
#পর্ব_০২
..
১০৪৮ খ্রিস্টাব্দের ১৮ সেপ্টেম্বর, পাসিনলার প্রান্তরে ৩০,০০০-৫০,০০০ সেলজুক সৈন্যের মুখোমুখি হয় ৫০,০০০-৭৫,০০০ সৈন্য সংখ্যার বাইজেনটাইন-জর্জিয়ান সম্মিলিত বাহিনী। যেখানে বাইজেনটাইনদের পক্ষ থেকে সেনাপতি ছিল অ্যারনিউস ও কাতাকালন কেকাউমেনোস [1], আর জর্জিয়া থেকে সেনাপতি ছিলো চতুর্থ লিপারিত। এছাড়া সেলজুকদের পক্ষ থেকে সেনাপতি ছিলো ইবরাহীম ইনাল বে, আসপান সালারিওস ও চোরোসান্তেস [2]। কোন কোন বর্ণনায় কুতালমিশ বেও এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন বলে জানা যায় [3]।
..
বাইজেন্টাইন ও সেলজুক উভয়পক্ষই তাদের বাহিনীকে তিন ভাগে বিভক্ত করে যুদ্ধ করে [4]। জর্জিয়ান সেনাপতি লিপারিত ছিল খ্রিস্টানদের মধ্যভাগে, সেলজুকদের মধ্যভাগ থেকে যার মোকাবেলা করেন আসপান সালারিওস। ডান দিক থেকে ইবরাহীম ইনাল মুখোমুখি হন কাতাকালান কেকাউমেনোসের। আর বাম দিকে চোরোসান্তেস লড়াই করেন অ্যারনিউসের সাথে [5]।
..
লড়াই শুরু হয় ভর সন্ধ্যার দিকে, চলতে থাকে পুরো রাতভর [6]।
..
উভয় পক্ষের মধ্যে প্রচন্ড লড়াই হয়। বাইজেন্টাইন সেনাপতি কাতাকালান কেকাউমেনোস ইবরাহীম ইনালের ডান অংশকে পরাজিত করে পিছু হটতে বাধ্য করেন, অবস্থা বেগতিক দেখে ইবরাহীম ইনাল তার মূল বাহিনীকে নিয়ে কিছুটা সরে এসে মধ্যবর্তী অংশ আসপান সালারিওসের অংশে যোগ দিয়ে লড়াই করতে থাকেন। এবং নিরাপদে সরে আসার জন্য কিছু সৈন্যকে ময়দানে রেখে আসেন, যেন কেকাউমেনোস বুঝতে না পারে যে ইবরাহীম বাহিনী নিয়ে সরে গিয়েছে [7]।
..
এদিকে সেলজুকদের বাম অংশের অবস্থা ছিলো আরো শোচনীয়। বুলগেরীয় বাইজেন্টাইন সেনাপতি অ্যারনিউস বাম দিকের সেলজুক সেনাপতি চোরোসান্তেসকে হত্যা করতে সক্ষম হয় এবং তার বাহিনীকে পুরোপুরি পিছু হটতে বাধ্য করে [8]।
..
এরই মধ্যে ইবরাহীম ইনাল সেনাপতি লিপারিতকে বন্দি করতে সক্ষম হয়। যদি তিনি বুঝতে পারেন যে এই যুদ্ধে একচ্ছত্র জয় পাওয়া সম্ভব নয়, তাই তিনি প্রধান সেনাপতি লিপারিতকে বন্দী করাকেই জয় ধরে নিয়ে তার মূল বাহিনী নিয়ে পিছু হটে আসেন এবং রাজধানীর পথে রওনা হয়ে যান [9]। ওদিকে তখনও অন্যান্য বাইজেন্টাই সেনাপতিদের কাছে লিপারিতের বন্দি হওয়ার খবর পৌঁছেনি। ভোরের আলো ফোটার পর যখন তারা বিজয় উদযাপন শুরু করবে ভাবছে তখনই তারা বুঝতে পারে এতক্ষন তারা সেই সেনাদের সাথে লড়ছিলো যাদেরকে সেলজুক বাহিনী নিরাপদে প্রস্থানের জন্য ব্যবহার করেছে। আর মূল সেলজুক বাহিনী সেনাপতি লিপারিতকে নিয়ে চলে গেছে।
..
মূলত ঐতিহাসিকগন এই যুদ্ধে বাইজেন্টাইনদেরকেই জয়ী হিসেবে ধরে থাকেন, যদিও এখানে সেলজুকদেরও পরাজিত বলা যায় না [10]। একচ্ছত্র জয় না পেলেও এই যুদ্ধ তাদের অর্জন থেকে খালি নয়।
..
সিরিজের সাথে বিশ্লেষণঃ
[1] যদিও ইতিহাস বলে কাতাকালান কেকাউমেনোস এই যুদ্ধে সশরীরে অংশগ্রহণ করেছেন তবে আল্প আরসালান বুয়ুক সেলজুক সিরিজে তা দেখানো হয়নি।
[2] সিরিজে এই সেনাপতিদের উপস্থিতি ছিল না একেবারেই।
[3] এটি সর্বসম্মত বর্ণনা নয় এবং সিরিজে তা দেখানোও হয়নি।
[4] পর্দায় এমন কোন ভাগ দেখা যায়নি, বরং পুরো বাহিনী একসাথে যুদ্ধ করেছে বলেই দেখানো হয়।
[5] এমন বিন্যাসও প্রদর্শন করা হয়নি সিরিজে।
[6] পাসিনলার যুদ্ধ রাতে হয়েছিল বলে ঐতিহাসিকদের সর্বসম্মত মত থাকলেও সিরিজে তা দিনে দেখানো হয়।
[7] প্রাথমিক অবস্থায় সেলজুকদের একপাক্ষিক পরাজয়ও দেখানো হয়নি পর্দায়।
[8] এই সেনাপতি এবং তার শাহাদাত কোনোটিই উঠে আসিনি সিরিজে।
[9] যদিও সিরিজে দেখানো হয় সেলজুকরা নয় বাইজেন্টাইনরাই পিছু হটে।
[10] এই যুদ্ধে সেলজুকদের পুরোপুরি পরাজিত না বলা গেলেও তা যে কোন ভাবেই একচ্ছত্র জয় নয় এটা সর্বসম্মত মত। কিন্তু আল্প আরসালান বুয়ুক সেলজুকে একে বাইজেন্টাইনদের শোচনীয় পরাজয় ও সেলজুকদের মহান বিজয় হিসেবে তুলে ধরা হয়।

