আপনি কি জানেন? উসমানীয় নৌবাহিনী সাবমেরিন থেকে প্রথম টর্পেডো ব্যবহার করে?
..
আমরা আজকে সাবমেরিন ও টর্পেডোর প্রথম ব্যবহার সম্পর্কে জানতে চেষ্টা করব। তাহলে চলুন শুরু করা যাক -
..
সাবমেরিন বা ডুবোজাহাজ হলো এক ধরনের জলযান বা ওয়াটার ক্রাফট। এটি পানির উপরে ও নিচে স্বাধীনভাবে চলাচল করতে পারে। এটি খুব সহজে সমুদ্রের গভীরে চলে যেতে পারে আবার সমুদ্রের গভীরতা মাপতে পারে। এটি লুকিয়ে থেকে খুব সহজেই শত্রুর উপর আক্রমণও করতে পারে। আকৃতি ও প্রকারভেদে একেকটি সাবমেরিন সাতদিন থেকে কয়েক বছর পর্যন্ত পানির নিচে লুকিয়ে থাকতে পারে। সাবমেরিনের সবচেয়ে উন্নত সংস্করণ হচ্ছে নিউক্লিয়ার সাবমেরিন বা পরমানু শক্তি চালিত সাবমেরিন। এধরনের সাবমেরিন বছরের পর বছর পানির নিচে লুকিয়ে থাকতে পারে। পরমাণু শক্তি চালিত সাবমেরিন তৈরি প্রক্রিয়া বেশ জটিল, তাই পৃথিবীর অল্প কয়েকটি দেশে এই প্রযুক্তি আছে।
..
সাবমেরিন সাবমার্জড এবং মার্জড উভয় অবস্থাতেই চলতে পারে এবং হামলা পরিচালনা করতে পারে। হুট করে ভেসে ওঠে শত্রুকে চমকে দিতে সক্ষম সাবমেরিন, আবার নিমিষেই পানিতে তলিয়ে গিয়ে হারিয়ে যায়। তাই সাবমেরিনকে কৌশলগত অস্ত্র বলা হয়। এই সাবমেরিন সহজেই সনাক্ত করা সম্ভব নয়, এজন্য ব্যবহার করা হয় অত্যাধুনিক প্রযুক্তি।
..
আদিকাল থেকেই পরীক্ষামূলকভাবে ডুবোজাহাজ নির্মাণ করা হয়েছে এবং ঊনবিংশ শতকে বিভিন্ন দেশের নৌবাহিনীতে এর ব্যবহার অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান সাবমেরিনের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড থেকে রক্ষা পেতে বিভিন্ন দেশের নৌবাহিনীতে সাবমেরিনের ব্যবহার অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে।
..
সাবমেরিন বা ডুবোজাহাজের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। অনেকের মতে আন্দালুসিয়ার (বর্তমান স্পেনের) উমাইয়া শাসকরা প্রথম সাবমেরিন ব্যবহার করে। আবার অনেকের মতে ৪০০ বছর আগে ১৬২০ সালে প্রথম সাবমেরিন আবিষ্কৃত হয়। এরপর ঊনবিংশ শতকে এসে সামরিক কাজে ব্যবহৃত হতে শুরু করে সাবমেরিন। ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম জেমসের অধীনে রাজকীয় নৌবাহিনীতে কর্মরত কর্নেলিয়াস জ্যাকবসজুন ড্রেবেল নামের এক ডাচ নাগরিক ১৬২০ সালে সাবমেরিন আবিষ্কার করেন বলে জানা যায়। তার আবিস্কৃত সাবমেরিনটি ড্রেবেলীয় সাবমেরিন নামে পরিচিত হয়ে আছে।
..
এরপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সাবমেরিনের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। শত্রুবাহিনীর জাহাজ কিংবা ডুবোজাহাজ আক্রমণ মোকাবেলায় এর ভূমিকা ব্যাপক। গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ারের ২০২০ সালের হিসেব অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের ৪০টি দেশে মোট ৫১৪টি সাবমেরিন আছে। সবচেয়ে বেশি সাবমেরিন রয়েছে চীনের, ৭৯টি। আমেরিকার ৬৮টি এবং রাশিয়ার রয়েছে ৬৪টি। বাংলাদেশেরও রয়েছে দুটি সাবমেরিন।
..
যেভাবে কাজ করে সাবমেরিন -
সাবমেরিন মূলত কাজ করে প্রাচীন গ্রিক বিজ্ঞানী আর্কিমিডিসের প্লবতার সূত্র অনুযায়ী ‘ব্যালাস্ট ট্যাঙ্ক’ থিওরির উপর ভিত্তি করে। উদাহরণস্বরূপ, একটা বোতলের ভেতর যখন বাতাস থাকে, তা কিন্তু পানিতে ভাসে। আবার বোতলের ভেতর পানি ভরা হলে তা ডুবে যাবে। অতএব, বোতলের ভেতর যদি কোন সিস্টেমে পানি অপসারিত করে বাতাস ঢোকানো যায়, তাহলে বোতলটা আবার পানিতে ভেসে উঠবে।
ঠিক একইভাবে পানির নিচে ডুব দেওয়ার জন্য সাবমেরিনে কতগুলো ব্লাস্ট ট্যাংক থাকে। ট্যাংকের বাল্ব খুলে সমুদ্রের পানিকে প্রবেশ করানো হয় যাতে সাবমেরিনটির ভেতরে পানি ঢুকে সাবমেরিনটি ক্রমশ ভারী হয়ে পানিতে নিমজ্জিত হতে থাকে। আবার উপরে ওঠার দরকার হলে সাবমেরিনটির ভেতরে থাকা কম্প্রেসড এয়ার এর মাধ্যমে পানিকে বের করে দেয়া হয়। ফলে সাবমেরিনটি হালকা হয়ে পানির সারফেসে চলে আসে।
..
সাবমেরিনের ব্যবহৃত অস্ত্র -
সাবমেরিনের ধরণ ও আকার অনুযায়ী সাবমেরিন বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র বহন করে থাকে। যেমন - ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র, টর্পেডো, নেভাল মাইন। তবে সাবমেরিনে ব্যবহৃত প্রধান অস্ত্র বলা হয় টর্পেডো।
..
সাবমেরিনের প্রথম টর্পেডো ব্যবহার -
বিশ্বের প্রথম সাবমেরিন হিসাবে আন্ডারওয়াটার টর্পেডো নিক্ষেপের কৃতিত্ব উসমানীয় নৌবাহিনীর "সাবমেরিন সুলতান আব্দুল হামিদ" সাবমেরিনের।
..
তৎকালীন উসমানীয় খিলাফতের মহান খলিফা আবদুল হামিদ খান উসমানীয় নৌবাহিনীতে সাবমেরিন যুক্ত করার পরিকল্পনা হাতে নেন। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী সাবমেরিনটি তৈরি হয়েছিল ১৮৮৬ সালে এবং সে বছরই এটি বিশ্বের প্রথম সাবমেরিন হিসাবে সাবমার্জড অবস্থায় টর্পেডো নিক্ষেপ করে। ১৮৮৮ সালে এটি আনুষ্ঠানিক ভাবে যুক্ত হয় উসমানীয় নৌবাহিনীতে এবং ১৯১০ সালে পর্যন্ত সার্ভিসে থাকে। খলিফা আবদুল হামিদ খানকে পদচ্যুত করার পর ইয়াং তুর্কস্ দের পরিকল্পনা অনুযায়ী এই সাবমেরিন ডিকমিশন করে দেওয়া হয়।
..
এটি ছিল ব্রিটিশ নররডেনফেল্ট ক্লাস সাবমেরিন, যার দুইটি সাবমেরিন "আবদুল হামিদ" ও "আবদুল মাজিদ" উসমানীয় নৌবাহিনীতে সার্ভিসে ছিলো।

